logo
১০ আশ্বিন ১৪২৫ - ১৪ মহররম ১৪৪০ - Sep 25, 2018 - Tue

   ফিচার

বিষণ্নতাকে হালকাভাবে নেবেন না

বিষণ্নতাকে হালকাভাবে নেবেন না


জেসমিন চৌধুরী

বিষণ্নতা রোগে ভুগছেন এমন একজন নারীর জন্য ছয় সপ্তাহব্যাপী একটা থেরাপি সেশনে দোভাষীর কাজ করছিলাম। আমি অবাক হয়ে দেখেছিলাম কীভাবে প্রতিটা সেশনে তার ভাবনার বরফ একটু একটু করে গলে যাচ্ছিল, নিজের একান্ত ভাবনাগুলো তুলে ধরছিলেন থেরাপিস্টের কাছে, কীভাবে একটু একটু করে তার অবস্থার উন্নতি ঘটছিল। প্রতি সিটিংয়ে তাকে আগের চেয়ে একটু হলেও হালকা মনে হচ্ছিল। একই সঙ্গে লক্ষ করছিলাম থেরাপিস্টের কর্মপদ্ধতি, যা আমার কাছে খুবই কার্যকর বলে মনে হয়েছে।

কাজটা করতে গিয়ে আমি ভাবছিলাম আমাদের দেশেও অনেকে এই রোগে ভুগে থাকেন কিন্তু জীবনের আরো হাজারটা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত সমস্যার আড়ালে এই ব্যাধি ঢাকা পড়ে যায়। অনেকে আবার বিষণ্নতাকে একটা রোগ বলেই মানতে চান না, এসব নিয়ে ভাবাকে আদিখ্যেতা বলে মনে করেন। ফলে সামাজিক ট্যাবুতে পরিণত হয়েছে এই মানসিক সমস্যা, যার ব্যাপ্তি খুব একটা কম নয়। লজ্জায় সংকোচে নিজের বিষণ্নতাকে ঘনিষ্ঠ মানুষদের কাছ থেকেও লুকিয়ে রাখেন অনেকে। নীরবে নিভৃতে বেড়ে ওঠে এই রোগ অনেক সময় একটা মানুষকে ধ্বংসের দিকেও ঠেলে দেয়। তখন চারদিক থেকে আহাজারির রোল উঠে, কেন কীভাবে মানুষটা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে গেলো কেউ তা ভেবে পায় না। ততদিনে অনেক বেশি দেরি হয়ে গেছে। 

বিষণ্নতা রোগ কেন হয় এ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, কিন্তু তারপরও এই বিষয়ে অনেক কিছুই মানুষের অজানা রয়ে গেছে। মনে করা হয় কোনও একটা কারণের দ্বারা আলোড়িত হয়ে মগজে ক্যামিকেলের ভারসাম্য নষ্ট হলে বিষণ্নতা রোগ হতে পারে, তবে বিষয়টাকে এত সরলীকরণও করা যাবে না। প্রতিটা মানুষই ভিন্ন এবং ব্যক্তিভেদে বিষণ্নতার কারণও বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। অনেক সময় কয়েকটা কারণের সমন্বয়ে এই রোগের বিকাশ ঘটতে পারে। পারিবারিক ইতিহাস, ব্যক্তিত্বের গঠন, মাত্রাতিরিক্ত মাদকদ্রব্য সেবন এই রোগের কারণ হিসেবে কাজ করলেও সাধারণভাবে জীবনের নানা টানাপোড়েন, ব্যর্থতা, কাজের চাপ, একাকিত্ব, সম্পর্কের ভেতরে নির্যাতন থেকে এই রোগের উৎপত্তি হতে পারে। 

আমার ক্লায়েন্ট মহিলাটি স্বল্পশিক্ষিত, ইংরেজি বা বাংলা কোনও ভাষাতেই মনের ভাব ব্যক্ত করতে পটু নন। খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল তার। বাচ্চারা খুব ছোট থাকতেই স্বামী তাকে ফেলে অন্য নারীকে নিয়ে ঘর বাঁধেন। অকূল সমুদ্রে পড়ে যান তিনি, বিদেশ বিভূঁইয়ে পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পান না। ইংরজি বলতে পারেন না, অফিস আদালতে কীভাবে কী করতে হয় কিছুই জানেন না, দুটো শিশুর একজন আবার প্রতিবন্ধী। সোশ্যাল সার্ভিসেসের সহায়তায় এই দিকটা সামলে নিলেও সামাজিক অপমান আর লোকলজ্জার ভয়ে মাটিতে মিশে থাকতেন তিনি, সেই নুয়ে থাকা মাথাটা এখনও পুরোপুরি সোজা করে দাঁড়াতে পারেননি। প্রায়ই মনে হয় এ জীবন বেঁচে কী লাভ? তার এই ভাবনার কথা জানতে পেরে অ্যান্টি ডিপ্রেসেন্ট ওষুধের পাশাপাশি তার জন্য থেরাপির ব্যবস্থা করা হয়। 

থেরাপিটা ছিল খুবই সাধারণ ধরনের। তাকে প্রতিদিনের কাজের রুটিন এবং পরের দিনের পরিকল্পনা নিয়ম মেনে লিখতে হতো। থেরাপিস্ট তাকে পরামর্শ দিয়েছিল দৈনিক প্রয়োজনীয় কাজের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় কিছু কাজ পরিকল্পনায় রাখার চেষ্টা করতে, যে কাজ অল্প হলেও আনন্দ দিতে পারে, প্রতিদিনের ঝামেলাপূর্ণ জীবনের মধ্যে একটুখানি আনন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করতে। সম্ভবত থেরাপিস্টকে কিছু একটা বলতে হবে দেখেই তিনি প্রতিদিন কিছু একটা করার চেষ্টা করতেন এবং সেটা ডায়েরিতে লিখে রাখতেন, যেমন- জিমে যাওয়া, শপিং করা, ছোটবেলার কোনও বন্ধুকে ফোনে কল দেওয়া। এরকম করতে করতে তার প্রতিদিনের ডায়েরিতে আনন্দের মাত্রা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠলো। প্রথম দিকে তিনি থেরাপি সেশনে আসতে চাইতেন না, শেষের দিকে অধীর আগ্রহে সপ্তাহের সেই দিনটির জন্য অপেক্ষা করতেন, যেদিন থেরাপিস্টের সঙ্গে দেখা হবে, কথা হবে।  

থেরাপিস্ট এই মহিলাকে আরও একটি ভালো পরামর্শ দিয়েছিল। মহিলা প্রায়ই বলতেন তিনি নিজের মুড ভালো রাখার চেষ্টা করেন কিন্তু দুশ্চিন্তা এসে সব ভেস্তে দেয়। এই কথার পর তার দুশ্চিন্তার বিষয়গুলোর একটা তালিকা বানানো হলো, বিষয়গুলোকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হলো- হাইপোথেটিক্যাল টেনশন এবং প্র্যাকটিকেল টেনশন। হাইপোথেটিকেল টেনশন হচ্ছে যে বিষয়গুলো আমাদের আওতার বাইরে সেগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তা করা- যেমন অতীতে যা ঘটে গেছে তা নিয়ে ভাবা, নিজের উচ্চতা বা গায়ের রং নিয়ে মন খারাপ করা, যেগুলো কিছুতেই বদলানো সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে প্র্যাকটিকেল টেনশন হচ্ছে যে বিষয়গুলো বদলানো যাবে সেগুলো নিয়ে ভাবা- যেমন, অর্থনৈতিক সমস্যা, শিক্ষার অভাব, অতিরিক্ত ওজন। এগুলো জটিল সমস্যা হলেও ভাবনাচিন্তার মাধ্যমে সমাধান বের করা সম্ভব হতে পারে। 

হাইপোথেটিকেল বিষয় নিয়ে বেশি ভাবলে বিষণ্নতা রোগ বেড়ে যেতে পারে, কাজেই এ ধরনের ভাবনা এলেই এগুলোকে দূরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। যেসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব সেগুলোর দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

এ ধরনের থেরাপিকে বলা হয় কগনিটিভ থেরাপি, যা হালকা মাপের বিষণ্নতা রোগ সারাতে ওষুধের মতোই কাজ করে। রোগের মাত্রা বেশি হলে সাইকিয়াট্রিক থেরাপি বা কাউন্সেলিং প্রয়োজন হয়। যারা নিজের মধ্যে নিম্নমাত্রার বিষণ্নতার আলামত দেখতে পান কিন্তু কারও কাছে প্রকাশ করতে পারেন না অথবা চিকিৎসা সেবা নেওয়ার সামর্থ্য নেই, তারা উপরের কৌশলগুলো অবলম্বন করে দেখতে পারেন। তবে সম্ভব হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, বিষণ্নতার মাত্রা যত হালকাই হোক, এই রোগকে হালকাভাবে নেবেন না। একে এড়িয়ে যাওয়ার ফলাফল ভারি হয়ে দাঁড়াতে পারে। 

লেখক: অভিবাসী শিক্ষক ও অনুবাদক




আজকের সকল সংবাদ

  বিজ্ঞাপন প্যানেল



  সম্পাদকীয়

  অনলাইন জরিপ

  পুরনো সংখ্যা


 



  বিজ্ঞাপন প্যানেল